ব্রহ্মাণীতলা, নাকাশিপাড়া, নদিয়া
শ্যামল কুমার ঘোষ
শিয়ালদহ-লালগোলা রেলপথে বেথুয়াডহরী একটি স্টেশন। শিয়ালদহ থেকে দূরত্ব ১২৮ কিমি। স্টেশন থেকে ৫ কিমি পশ্চিমে নাকাশিপাড়া গ্রাম। প্রাচীন নাম 'নাগরকি পাড়া'। বেথুয়াডহরী স্টেশন থেকে টোটোতে সহজেই এই গ্রামে যাওয়া যায়। ৩৪ নং জাতীয় সড়ক বেথুয়াডহরীর উপর দিয়ে গেছে। তাই ৩৪ নং জাতীয় সড়ক ধরেও এই গ্রামে যাওয়া যায়।
নাকাশিপাড়ার ব্রহ্মাণীতলায় লৌকিক দেবী ব্রহ্মাণীর পূজা উপলক্ষ্যে প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তিতে মেলা বসে। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মানত করে, পূজা দেয়। বিরাট এক অশ্বত্থগাছের নিচে ব্রহ্মাণী দেবীর থান। তিনি সর্পদেবী মনসার প্রকারভেদ। স্থানীয় জমিদার ডোমনচন্দ্র সিংহরায় স্বপ্নাদেশে তাঁর জমিদারির মধ্যে এক জঙ্গলে এই পূজার প্রবর্তন করেন। পরে জায়গাটির নাম হয় ব্রহ্মাণীতলা। বাঁধানো গাছতলায় আগে ঘট বসিয়ে তাঁর পূজা হত। আজকাল প্রতিমা পূজা হচ্ছে।
ডোমনচন্দ্রের পূর্বপুরুষ রামরাম সিংহ কৃষ্ণনগরের রাজার দেহরক্ষীর কাজ নিয়ে এদেশে আসেন। তিনি ভাল লাঠিয়াল ছিলেন। তাঁদের আদি বাসভূমি ছিল বুন্দেলখণ্ড। রাজবাড়ির সূত্রেই সিংহ পরিবার নাকাশিপাড়ার জমিদারি লাভ করেন। রামরাম সিংহ মহাশয়ের তিন পুরুষ পর অর্থাৎ বিনোদবিহারী, নীলকণ্ঠ এবং সুজন সিংহের পর ডোমনচন্দ্র জমিদারি পান।
ডোমনচন্দ্রের স্বপ্নাদেশ সম্পর্কে একটি কিংবদন্তি আছে। তাঁর সময়ে একদিন এক শাঁখারি কাছারিতে এসে উপস্থিত হয়ে বলেন যে তিনি স্বয়ং জমিদারের সঙ্গে দেখা করতে চান। তাঁকে জমিদারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি জমিদারকে বললেন, আপনার মেয়ে জঙ্গলের মধ্যে শাঁখা পরেছে। শাঁখা পরার পর দাম চাইলে বলেছেন, আমি জমিদারের মেয়ে। আমার বাবার কাছ থেকে দাম নিয়ে নিও। শাঁখারির কথা বুজরুকি ভেবে জমিদার দাম দিতে অস্বীকার করলে শাঁখারি বলেন, মেয়েটি আরো বলেছে, বাড়ির কাছের দীঘিতে সিঁড়ির ধারে একটি কুলুঙ্গি আছে। সেই কুলুঙ্গিতে যা পয়সা আছে তার থেকেই শাঁখার দাম মিটিয়ে দিতে।
শাঁখারির এই কথা শুনে ডোমনচন্দ্র তাঁর কর্মচারীসহ সেই দীঘির ঘাটে উপস্থিত হলেন। কুলুঙ্গির খোঁজাখুঁজি চলছে। এমন সময় মাঝ দীঘিতে দুটি শাঁখা পরা সুন্দর হাত দেখা গেল। কুলুঙ্গির মধ্যেও অনেক ধনসম্পদ পাওয়া গেল। শাঁখার দাম মেটানোর পর সেই শাঁখারীকে আর দেখা গেল না।
সেদিন রাতে ডোমনচন্দ্র স্বপ্ন দেখলেন, এক সুন্দরী অপরূপা মাতৃরূপা নারী তাঁকে বলছেন, আমি মা ব্রহ্মাণী, তোর গ্রামে এসেছি, পূজা দিস্। জঙ্গলের মধ্যেই আমি থাকবো। দেবীর আদেশ পেয়ে ডোমনচন্দ্র ব্রহ্মাণী পূজার প্রচলন করেন। জঙ্গলের মধ্যে যে অশ্বত্থগাছের তলায় দেবী শাঁখা পরেছিলেন সেখানে ঘট স্থাপন করে ব্রহ্মাণী পূজা শুরু করেন। সেই থেকে প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তিতে ব্রহ্মাণী পূজা হয়ে আসছে। এই উপলক্ষ্যে মেলাও বসে।
![]() |
ব্রহ্মাণী দেবীর থান |
সহায়ক গ্রন্থ / প্রবন্ধ :
১) নদীয়া জেলার পুরাকীর্তি : মোহিত রায় ( তথ্য-সংকলন ও গ্রন্থনা )
২) ব্রহ্মাণীর পূজা ও মেলা : মানিক সরকার ( প্রবন্ধ, কৌশিকী পত্রিকা ৪ র্থ বর্ষ ১১শ - ১২ শ সংখ্যা কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৮১ )
----------------------------------------------------------
রামায়ণের ৭টি খণ্ডের ৬৪ টি উপাখ্যান ও ১৮৫ টি টেরাকোটা ফলকের আলোকচিত্র সংবলিত আমার লেখা এবং 'রা প্রকাশন' কর্তৃক প্রকাশিত বই 'বাংলার টেরাকোটা মন্দিরে রামায়ণ' প্রকাশিত হয়েছে।
বইটি ডাক যোগে সংগ্রহ করতে হলে যোগাযোগ করুন : 9038130757 এই নম্বরে।
কলকাতার কলেজস্ট্রিটের মোড়ে দুই মোহিনীমোহন কাঞ্জিলালের কাপড়ের দোকানের মাঝের রাস্তা ১৫, শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটের উপর অবস্থিত বিদ্যাসাগর টাওয়ারের দু'তলায় 'রা প্রকাশনে'র দোকান। ওখান থেকে বইটি সংগ্রহ করতে পারেন। কোনও অসুবিধা হলে উপরোক্ত নম্বরে ফোন করতে পারেন।
--------------------------------------------------------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন