রামচন্দ্রের মন্দির, গুপ্তিপাড়া, হুগলি
শ্যামল কুমার ঘোষ
ব্যাণ্ডেল-কাটোয়া রেলপথে গুপ্তিপাড়া একটি স্টেশন। ব্যাণ্ডেল থেকে দূরত্ব ৩৫ কি. মি.। স্টেশন থেকে দেড় কি.মি. দূরে তারকেশ্বরের মোহান্তের অধীন দশনামী শৈবসম্প্রদায়ের মঠবাড়ি এলাকায় গুপ্তিপাড়ার প্রসিদ্ধ মন্দিরগুলি অবস্থিত। এই মঠবাড়ি এলাকায় মোট চারটি মন্দির বর্তমান। কৃষ্ণচন্দ্রের 'আটচালা', মহাপ্রভুর 'জোড়বাংলা', বৃন্দাবনচন্দ্রের 'আটচালা' ও রামচন্দ্রের 'একরত্ন'। মন্দিরগুলি একসঙ্গে 'বৃন্দাবনচন্দ্রের মঠ' বা 'গুপ্তিপাড়ার মঠ' নামে পরিচিত।
এখানে আলোচ্য বিষয় শ্রী রামচন্দ্রের মন্দির। অন্য তিনটি মন্দিরের আলোচনা অন্যত্র করেছি। এই তিনটি মন্দির সম্বন্ধে জানতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন :
বৃন্দাবনচন্দ্রের মঠ, গুপ্তিপাড়া, হুগলি
গুপ্তিপাড়ার উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্য শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির। বাঁশবেড়িয়ার অনন্ত বাসুদেব মন্দিরের মত এর গড়ন। এরূপ কারুকার্যখচিত মন্দির পশ্চিমবঙ্গে খুব কমই আছে। এর টেরাকোটার কাজ খুবই উচ্চ শ্রেণীর। উঁচু ভিত্তিবেদির উপর স্থাপিত, পশ্চিমমুখী, ইঁটের তৈরী মন্দিরটি বাংলা একরত্ন শ্রেণীর। মন্দিরের শিখর-রত্নটি আটকোণা। মন্দিরের সামনে তিনটি পত্রাকৃতি খিলান যুক্ত আবৃত অলিন্দ আছে। সামনের ত্রিখিলান প্রবেশপথের ওপরের তিনপ্রস্থে, থাম ও ভিত্তিবেদি সংলগ্ন দেওয়ালে এবং শিখরে প্রচুর উৎকৃষ্ট টেরাকোটা আছে। টেরাকোটায় রাধাশ্যামের মূর্তি, গরুড়বাহন বিষ্ণু, রাবণের যুদ্ধযাত্রা প্রভৃতি সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। একটি খিলানের উপর প্রার্থনার ভঙ্গিতে যুক্ত শত শত গোপিনী মূর্তি পোড়ামাটির অলংকরণের একটি সুন্দর নিদর্শন। প্রবেশ পথের দু পাশে তিন সারিতে ও উপরে দু সারিতে নিবদ্ধ নকশা করা ফ্রেমের মধ্যে (কুলুঙ্গি ) রাধা-কৃষ্ণ ও নরনারীর নানা ভঙ্গিমার চিত্র ফুটে উঠেছে। এরূপ সুক্ষ্ম ও ছন্দময় কারুকার্য হুগলি জেলার কোন মন্দিরে নেই। তবে এর বেশির ভাগ মূর্তিই নষ্ট হয়ে গেছে। থামের উপরের দিকের ও অলিন্দের মধ্যের টেরাকোটাগুলি কলিচুনের প্রলেপে নষ্ট বা ম্লান হয়ে গেছে। দক্ষিণ দিকের দেওয়ালেও প্রচুর টেরাকোটার কাজ আছে। তবে এখানে তিনটি খিলান ছাড়া অন্যত্র টেরাকোটার ফুলের আধিক্যই বেশি। রামচন্দ্রের মন্দির পোড়ামাটির সজ্জার জন্য বাংলার অন্যতম টেরাকোটা মন্দির বলে পরিগণিত। মন্দিরের সামনের দিকে তিনটি প্রবেশদ্বার। সোজাসুজি একটি বড়, দুপাশে দুটি ছোট-ছোট। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটা করে জানলা আছে। পূর্ব দিকে কোন জানলা বা দরজা নেই। গর্ভগৃহে রামচন্দ্র, সীতা, লক্ষ্মণ ও হনুমানের দারু মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে শেওড়াফুলির রাজা হরিশচন্দ্র রায় মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন।
মন্দিরটি পরিদর্শনের তারিখ : ১৮.০৩.২০১৬
 |
| রামচন্দ্রের মন্দির |
 |
| আটকোণা শিখর-রত্ন |
 |
সামনের দিকের খিলানের উপরের কাজ -১
( রাম-রাবণের যুদ্ধ ) |
 |
সামনের দিকের খিলানের উপরের কাজ -২
( রাসমণ্ডল, ব্রহ্মা, লক্ষ্মী-সরস্বতী সহ গরুড়বাহন বিষ্ণু ও মহেশ্বর
এবং প্রার্থনার ভঙ্গিতে যুক্ত শত শত গোপিনী মূর্তি ) |
 |
| ব্রহ্মা, লক্ষ্মী-সরস্বতী সহ গরুড়বাহন বিষ্ণু ও মহেশ্বর |
 |
সামনের দিকের খিলানের উপরের কাজ -৩
|
 |
| দক্ষিণ দিকের খিলানের উপরের কাজ -১ |
 |
| দক্ষিণ দিকের খিলানের উপরের কাজ -২ |
 |
| দক্ষিণ দিকের খিলানের উপরের কাজ -৩ |
 |
সামনের দিকের দুটি খিলানের মধ্যের টেরাকোটার অলংকরণ
( বলরাম ) |
 |
| রাস নৃত্য -১ |
 |
| রাস নৃত্য -২ |
 |
| থামের গায়ে টেরাকোটার অলংকরণ |
 |
| মহিষমর্দিনী ও ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর-কল্কি |
 |
| রাসমণ্ডল |
 |
| টেরাকোটার অলংকরণ |
 |
কুলুঙ্গিতে নিবদ্ধ টেরাকোটার অলংকরণ - ১
( রাধা-কৃষ্ণ ) |
 |
কুলুঙ্গিতে নিবদ্ধ টেরাকোটার অলংকরণ - ২
( রাধা-কৃষ্ণ ) |
 |
কুলুঙ্গিতে নিবদ্ধ টেরাকোটার অলংকরণ - ৩
( রাধা-কৃষ্ণ ) |
 |
কুলুঙ্গিতে নিবদ্ধ টেরাকোটার অলংকরণ - ৪
( বলরাম ও রেবতী ) |
 |
কুলুঙ্গিতে নিবদ্ধ টেরাকোটার অলংকরণ - ৫
( রাধা-কৃষ্ণ ) |
 |
ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন টেরাকোটার অলংকরণ - ১
( উপরে, কৃষ্ণলীলা ) |
 |
ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন টেরাকোটার অলংকরণ - ২
( উপরে, কৃষ্ণলীলা ) |
 |
ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন টেরাকোটার অলংকরণ - ৩
( উপরে, কৃষ্ণলীলা ) |
 |
ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন টেরাকোটার অলংকরণ - ৪
( উপরে, রামায়ণ কাহিনী ) |
 |
ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন টেরাকোটার অলংকরণ - ৫
( উপরে, রামায়ণ কাহিনী ) |
 |
ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন টেরাকোটার অলংকরণ - ৬
( উপরে, রামায়ণ কাহিনী ) |
 |
ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন টেরাকোটার অলংকরণ - ৭
( উপরে, কৃষ্ণলীলা ) |
 |
| ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন টেরাকোটার অলংকরণ - ৮ |
 |
| রাম, লক্ষ্মণ ও সীতার দারুমূর্তি |
গুপ্তিপাড়ার মঠে যেতে হলে শিয়ালদহ থেকে সকাল ৮ টা ৬ মিনিটের কাটোয়া লোকাল বা হাওড়া থেকে কাটোয়া লোকাল ধরুন । ব্যাণ্ডেল থেকেও গুপ্তিপাড়া যাওয়ার গাড়ি পাবেন । স্টেশন থেকে মন্দিরে যাওয়ার রিকশা, টোটো বা ভ্যান রিকশা পাবেন ।
সহায়ক গ্রন্থাবলি :
১. বাংলার মন্দির : স্থাপত্য ও ভাস্কর্য : প্রণব রায়
২. District Handbook, 1951, hooghly by A. Mitra, p 227
৩. পশ্চিমবঙ্গের পুরাকীর্তি : রামরঞ্জন দাস
----------------------------------------------------------
অগ্রদ্বীপের গোপীনাথকে নিয়ে নদিয়ার কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে শোভাবাজার রাজবাড়ির মহারাজা নবকৃষ্ণের মামলা হয়েছিল এবং সে মামলা প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। বিষ্ণুপুরের প্রাণের দেবতা মদনমোহনকে মল্লরাজ চৈতন্য সিংহ কলকাতার গোকুল মিত্রের কাছে বন্ধক দিয়েছিলেন। আড়ংঘাটার যুগলকিশোর দর্শন করতে আসা মহিলাদের বিশ্বাস, জ্যৈষ্ঠমাসে যুগলকিশোর দর্শন করে পুজো দিলে এ জন্মে, এমনকি পরজন্মেও বৈধব্যদশা ভোগ করতে হয় না। বিধবাদেরও পরজন্মে বৈধব্যদশা ভোগ করতে হবে না। অনেক ভক্তদের বিশ্বাস, শ্রীরামপুরের বল্লভপুরের রাধাবল্লভ, খড়দহের শ্যামসুন্দর এবং
সাঁইবনার নন্দদুলাল -এই তিনটি বিগ্রহ উপবাসে থেকে একই দিনে দর্শন করলে আর
পুনর্জন্ম হয় না।
বঙ্গের এইরকম চোদ্দোটি মন্দির ও বিগ্রহের অজানা কাহিনি নিয়ে আমার লেখা এবং 'রা প্রকাশন' কর্তৃক প্রকাশিত বই 'মন্দির ও বিগ্রহের কাহিনি'। মুদ্রিত মূল্য: ৩৯৯ টাকা।
রামায়ণের ৭টি খণ্ডের ৬৪ টি উপাখ্যান ও ১৮৫ টি টেরাকোটা ফলকের আলোকচিত্র সংবলিত আমার লেখা এবং 'রা প্রকাশন' কর্তৃক প্রকাশিত বই 'বাংলার টেরাকোটা মন্দিরে রামায়ণ'। বইটির মুদ্রিত মূল্য - ৫৯৯ টাকা।
বই দুটি ডাক যোগে সংগ্রহ করতে হলে যোগাযোগ করুন : 9038130757 এই নম্বরে।
কলকাতার কলেজস্ট্রিটের মোড়ে দুই মোহিনীমোহন কাঞ্জিলালের কাপড়ের দোকানের মাঝের রাস্তা ১৫, শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটের উপর অবস্থিত বিদ্যাসাগর টাওয়ারের দু'তলায় 'রা প্রকাশনে'র দোকান ( রা বইহেমিয়ন )। ওখান থেকে বইটি সংগ্রহ করতে পারেন। কোনও অসুবিধা হলে উপরোক্ত নম্বরে ফোন করতে পারেন।
I am like this mandir
উত্তরমুছুন