মঙ্গলবার, ১০ মে, ২০২২

Gandheswari Temple, Rajendra Deb Lane, Kolkata

 

গন্ধেশ্বরী মন্দির, রাজেন্দ্র দেব লেন, কলকাতা

                                 শ্যামল কুমার ঘোষ

             গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের পূজিতা দেবী গন্ধেশ্বরী। তিনি দেবী  দুর্গারই আর এক রূপ। গন্ধবণিক সম্প্রদায় হচ্ছে বাঙালি হিন্দু বণিক  সম্প্রদায়ের একটি গোষ্ঠী যাঁরা প্রাচীন কাল থেকে মূলত গন্ধ দ্রব্যের ব্যবসা করে আসছেন। গন্ধ দ্রব্য যেমন -  প্রসাধন দ্রব্য, ধূপ, চন্দন কাঠ, সিঁদুর, বিভিন্ন রকমের মশলা ইত্যাদি। পরে অবশ্য তাঁরা অন্য ব্যবসাতেও যুক্ত হয়েছেন। যেমন - ওষুধ, অস্ত্র ইত্যাদি। বন্দুক ব্যবসায়ী এন. সি. দাঁয়ের পরিবার ও শোভাবাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী  বটকৃষ্ণ পালের পরিবার এই গন্ধবণিক সম্প্রদায়ভুক্ত।    

            দেবী গন্ধেশ্বরীর উৎপত্তির পৌরাণিক কাহিনী : সুভুতির  ঔরসে ও তপতি নামের এক রাক্ষসীর গর্ভে গন্ধাসুরের জন্ম।  মহাদেবের বরে সে পরাক্রমশালী ও ত্রিভুবনবিজয়ী হয়ে ওঠে।  সুভুতি বৈশ্যকন্যা সুরূপাকে হরণ করতে গিয়ে বৈশ্যদের কাছে চূড়ান্ত  অপমানিত হয়। গন্ধাসুর পিতার অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য  বৈশ্যদের উপর অত্যাচার শুরু করে। একদিন সুবর্ণবট নামক এক  বৈশ্যকে আক্রমণ করে হত্যা করে। তাঁর স্ত্রী চন্দ্রাবতী প্রাণ ভয়ে  পালিয়ে গিয়ে এক বনে আশ্রয় নেন। চন্দ্রাবতী ছিলেন গর্ভবতী। বনে  তিনি এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়ে মারা যান। সেই বনে ছিল ঋষি  কশ্যপের আশ্রম। ঋষি কশ্যপ ধ্যানযোগে এই ঘটনা জেনে সেখানে  উপস্থিত হয়ে মৃতা চন্দ্রাবতীর পাশে সেই শিশুকন্যার দেখা পেলেন। চন্দ্রাবতীর দেহ যথাযথ সৎকার করে তিনি সেই শিশুকন্যাকে নিজ  আশ্রমে নিয়ে এলেন। শিশুকন্যার দেহ থেকে সুগন্ধ ছড়াতে  দেখে শিশুকন্যার নাম রাখলেন গন্ধবতী। বড় হয়ে গন্ধবতী ঋষির  কাছে তার পিতামাতার মৃত্যুর কারণ জানলেন। সব জেনে তাঁর মনে  প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠল। গন্ধবতী যজ্ঞের আগুন জ্বেলে  মহামায়ার তপস্যায় ব্রতী হলেন। এদিকে গন্ধাসুর গন্ধবতীর  রূপলাবণ্যের কথা শুনে সেই আশ্রমে উপস্থিত হল। ধ্যানমগ্ন  গন্ধবতীকে দেখে তার রূপে মোহিত হয়ে তাকে প্রেম  নিবেদন করতে  লাগল। কিন্তু কিছুতেই গন্ধবতীর ধ্যান ভঙ্গ না হওয়াতে  উত্তেজিত হয়ে তার চুলের মুঠি ধরে আকর্ষণ করল। নারীর  অপমানে রুষ্ট হয়ে যজ্ঞকুণ্ড ধূমায়িত হয়ে উঠল এবং সেই যজ্ঞকুণ্ড থেকে  উঠে এলেন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিতা চতুর্ভুজা এক সিংহবাহিনী দেবী। গন্ধবতীর ধ্যান ভঙ্গ হল। তিনি দেবীকে প্রণাম করলেন। দেবী তাঁকে  অভয় দান করে রোষ-নয়নে গন্ধাসুরের দিকে এগিয়ে গেলেন। গন্ধাসুর বিশাল দেহ ধারণ করে দেবীকে আক্রমণ করল। শুরু হল  ঘোরতর যুদ্ধ। দেবতারা সেই যুদ্ধ দেখতে ছুটে এলেন। তুমুল যুদ্ধের  শেষে দেবী তাঁর ত্রিশুল দিয়ে গন্ধাসুরকে বিদ্ধ করে বধ করলেন।  তারপর দেবী প্ৰচণ্ড রোষে গন্ধাসুরের দেহ সমুদ্রে নিক্ষেপ করলেন।  উপস্থিত দেবতারা দেবীর নাম দিলেন 'গন্ধেশ্বরী'। দেবীর ইচ্ছানুসারে  গন্ধাসুরের বিশাল দেহ পরিণত হল এক বিশাল দ্বীপে। সেই দ্বীপে  উদ্ভূত হল মশলা ও সুগন্ধি বৃক্ষ-লতা। দেবী বেনে সম্প্রদায়ের  একটি গোষ্ঠীকে সেই দ্বীপ থেকে মশলা, গন্ধদ্রব্য ইত্যাদি আহরণ করে  বাণিজ্য করার অধিকার দিলেন, তাঁদের নাম হল গন্ধবণিক।            

             কলকাতায় গন্ধেশ্বরী মাতার মন্দির আছে ঠনঠনিয়া  সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের অনতিদূরে। বর্তমান ঠিকানা -- ২১ সি,  রাজেন্দ্র দেব লেন। পশ্চিমমুখী মন্দিরটি একটি ছোট ঘর মাত্র।  সামনে একটি নাটমন্দির আছে। গর্ভগৃহে অষ্টধাতুর গন্ধেশ্বরী মাতা  প্রতিষ্ঠিতা। বিগ্রহ প্রায় তিন ফুট উঁচু। চতুর্ভুজা দেবী  সিংহের  উপর  আসিনা। ত্রিশূল দিয়ে যেন গন্ধাসুরকে বধ করছেন। নিত্য পূজা  ছাড়াও বৈশাখ মাসে বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন গন্ধেশ্বরী মাতার বিশেষ পূজা  অনুষ্ঠিত হয়। এ দিন গন্ধবণিক সমাজের সমস্ত মানুষ মন্দিরে  উপস্থিত হন মায়ের কাছে প্রার্থনা ও পূজা দেওয়ার জন্য। তাঁরা সারা  বছরের নিজেদের ব্যবসার সমৃদ্ধি কামনা করে মায়ের আশীর্বাদ  প্রার্থনা করেন। এ দিন বিশেষ পূজা উপলক্ষ্যে মায়ের কাছে খিচুড়ি  ভোগ নিবেদন করা হয়। পরে মন্দিরে উপস্থিত ভক্তবৃন্দ সেই ভোগ  পেয়ে থাকেন।

             মন্দির চত্বরের মধ্যে আছে একটি ছাত্রাবাস। এখানে গ্রাম  থেকে কলকাতায় পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা স্বল্পমূল্যে থাকতে পারেন।  এখানে উল্লেখ্য, গন্ধবণিক মহাসভা নানা জনহিতকর কাজের সঙ্গে  যুক্ত।    

             ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের ১৪ই বৈশাখ এই মন্দিরের ভিত্তি প্রস্তর  স্থাপন করেন হরিশঙ্কর পাল। ১৩৪৬ বঙ্গাব্দের ১৭ই বৈশাখ,  সোমবার, শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে মন্দিরে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়।  প্রতিষ্ঠা করেন সেই সময়ের গন্ধবণিক মহাসভার সভাপতি  নৃত্যগোপাল রুদ্র। মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে দুটি শ্বেতপাথরের  ফলক আছে।

             সকাল ৬ টা. থেকে ১১ টা এবং সন্ধ্যা ৬ টা থেকে ৭ টা  পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে

             কী ভাবে যাবেন?

             কলকাতার কলেজ স্ট্রিট মোড় থেকে বিধান সরণি ধরে  শ্যামবাজারের দিকে একটা স্টপেজ এগিয়  গেলে পড়বে ঠনঠনিয়া  সিদ্ধেশ্বরী কালী বাড়ি। এই মন্দিরের কাছে অবস্থিত রাজেন্দ্র দেব  লেন ধরে খানিকটা এগিয়ে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই পেয়ে যাবেন  মন্দির।   

গন্ধেশ্বরী মাতা -১

মন্দিরের ফটক

গন্ধেশ্বরী মাতা -২

গন্ধেশ্বরী মাতা -৩

মন্দিরের ভিত্তি প্রস্তরফলক

মন্দিরের বিগ্রহের প্রতিষ্ঠাফলক
 

            -------------------------------------------

রামায়ণের ৭টি খণ্ডের ৬৪ টি উপাখ্যান ও ১৮৫ টি টেরাকোটা ফলকের আলোকচিত্র সংবলিত আমার লেখা এবং 'রা প্রকাশন' কর্তৃক প্রকাশিত বই 'বাংলার টেরাকোটা মন্দিরে রামায়ণ' প্রকাশিত হয়েছে। বইটির মুদ্রিত মূল্য - ৫৯৯ টাকা।

 বইটি ডাক যোগে সংগ্রহ করতে হলে যোগাযোগ করুন :  9038130757 এই নম্বরে। 

কলকাতার কলেজস্ট্রিটের মোড়ে দুই মোহিনীমোহন কাঞ্জিলালের কাপড়ের দোকানের মাঝের রাস্তা ১৫, শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটের উপর অবস্থিত বিদ্যাসাগর টাওয়ারের দু'তলায় 'রা প্রকাশনে'র দোকান। ওখান থেকে বইটি সংগ্রহ করতে পারেন। কোনও অসুবিধা হলে উপরোক্ত নম্বরে ফোন করতে পারেন।

             প্রকাশনীতে বইটি সেরা বইয়ের সম্মান স্বর্ণকলম ২০২৫ পেয়েছে ।


             

সোমবার, ৯ মে, ২০২২

Ramsita Temple, Sankharitola Street, Kolkata

 

রামসীতা মন্দির, শাঁখারিটোলা স্ট্রিট,  কলকাতা 

                  শ্যামল কুমার ঘোষ 

            ভারতের হিন্দিভাষী অঞ্চলের মতো বাংলায় রাম-উপাসনা খুব বেশি জনপ্রিয় না হলেও রামায়ণের কাহিনী বাংলার সাধারণ মানুষের  কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিল। বিশেষ করে কৃত্তিবাসী রামায়ণ। এক  সময় বাংলার অনেক বাড়িতে সন্ধ্যায় প্রদীপ বা হারিকেনের আলোয় কৃত্তিবাসী রামায়ণ পাঠের প্রচলন ছিল। বাংলার পল্লীতে-পল্লীতে  সন্ধ্যায় রামায়ণ গানের আসর বসতো। এই আসর চলতো এক  মাসেরও বেশি সময় ধরে। আসরের শেষে রাম-সীতার গলার  অকিঞ্চিৎকর মালা নিলামে বিক্রি হতো। এর থেকেই বোঝা যায় যে  বাংলার জন-মানসে রামসীতা কত খানি প্রভাব বিস্তার করে ছিল।

             বাংলায় রাম-উপাসনা একেবারেই ছিল না তা কিন্তু সঠিক  নয়। বাংলার কিছু কিছু মন্দিরের গর্ভগৃহে যেমন রাম-সীতা-লক্ষণের  বিগ্রহ পূজিত হয় তেমনি কিছু কিছু মন্দিরে শালগ্রাম শিলায় রঘুনাথ  রামচন্দ্রের পূজাও অনুষ্ঠিত হয়। এমন কি অনেক কৃষ্ণমন্দিরেও  আলাদা করে রামচন্দ্রের বিগ্রহও পূজিত হন।

              আমারমতো অনেক কলকাতাবাসীর অগোচরে প্রায়  একশো বছর ধরে রামসীতা বিগ্রহ পূজিত হচ্ছেন এই কলকাতায়।  কলকাতার শিয়ালদহের কাছে আর. আহমেদ দাঁতের হাসপাতালের  পাশের গলির নাম ক্রিক রোড। এই রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে ডান  দিকের রাস্তা ধরে একটু এগুলেই বাঁ দিকে পড়বে একটি লাল রঙের  বাড়ি। এই বাড়ির এক তলায় আছে রামসীতার মন্দির। দরজা দিয়ে  ঢুকে ডান দিকে তাকালেই চোখে পড়বে বিগ্রহ। সামনে বিশাল প্রশস্থ  চত্বর। শ্বেতপাথরের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলে পড়বে গর্ভগৃহ।  গর্ভগৃহের সামনে অলিন্দ। গর্ভগৃহে রামসীতা ও অন্যান্য বিগ্রহ নিত্য  পূজিত। নিত্য পূজা ছাড়াও রাম নবমীতে মন্দিরে বিশেষ পূজা  অনুষ্ঠিত হয়।  

            ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই জুলাই ( ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৩০শে  আষাঢ় ) মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠা করেন শীতল চন্দ্র  বন্দোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী রাজলক্ষ্মী দেবী। মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে  একটি শ্বেতপাথরের প্রতিষ্ঠাফলক আছে।      

রামসীতা বিগ্রহ 

মন্দিরের প্রবেশদ্বার 

গর্ভগৃহে ওঠার সিঁড়ি 

রামসীতা ও অন্যান্য বিগ্রহ

রামসীতা বিগ্রহ

প্রতিষ্ঠাফলক

           পশ্চিমবঙ্গের  অন্যান্য  রামসীতা  মন্দিরগুলি  সম্বন্ধে  জানতে  নিচের  লিঙ্কগুলিতে  ক্লিক  করুন :

                          

           

          -------------------------------------------

অগ্রদ্বীপের গোপীনাথকে নিয়ে নদিয়ার কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে শোভাবাজার রাজবাড়ির মহারাজা নবকৃষ্ণের মামলা হয়েছিল এবং সে মামলা প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। বিষ্ণুপুরের প্রাণের দেবতা মদনমোহনকে মল্লরাজ চৈতন্য সিংহ কলকাতার গোকুল মিত্রের কাছে বন্ধক দিয়েছিলেন। আড়ংঘাটার যুগলকিশোর দর্শন করতে আসা মহিলাদের বিশ্বাসজ্যৈষ্ঠমাসে যুগলকিশোর দর্শন করে পুজো দিলে  জন্মেএমনকি পরজন্মেও  বৈধব্যদশা ভোগ করতে হয় না। বিধবাদেরও পরজন্মে বৈধব্যদশা ভোগ করতে হবে না। অনেক ভক্তদের বিশ্বাসশ্রীরামপুরের বল্লভপুরের রাধাবল্লভখড়দহের শ্যামসুন্দর এবং 
সাঁইবনার নন্দদুলাল -এই তিনটি বিগ্রহ উপবাসে থেকে একই দিনে দর্শন করলে আর
পুনর্জন্ম হয় না।

 বঙ্গের এইরকম চোদ্দোটি মন্দির  বিগ্রহের অজানা কাহিনি নিয়ে আমার লেখা এবং 'রা প্রকাশন' কর্তৃক প্রকাশিত বই  'মন্দির ও বিগ্রহের কাহিনি' মুদ্রিত মূল্য: ৩৯৯ টাকা। 



রামায়ণের ৭টি খণ্ডের ৬৪ টি উপাখ্যান ও ১৮৫ টি টেরাকোটা ফলকের আলোকচিত্র সংবলিত আমার লেখা এবং 'রা প্রকাশন' কর্তৃক প্রকাশিত বই 'বাংলার টেরাকোটা মন্দিরে রামায়ণ'। বইটির মুদ্রিত মূল্য - ৫৯৯ টাকা।



 বই দুটি ডাক যোগে সংগ্রহ করতে হলে যোগাযোগ করুন :  9038130757 এই নম্বরে। 

কলকাতার কলেজস্ট্রিটের চার মাথা মোড়ের হাওড়ার দিকের রাস্তায় ৯৩, মহাত্মা গান্ধী রোডে অবস্থিত হিন্দু সৎকার সমিতি বিল্ডিং-এর দু তলায় ( টেকনো ওয়ার্ল্ড -এর বিপরীতে ) 'রা প্রকাশন ও মুদ্রণের' বিপণি 'রা বইহেমিয়ন'। ওখান থেকে বইটি সংগ্রহ করতে পারেন। কোনও অসুবিধা হলে উপরোক্ত নম্বরে ফোন করতে পারেন।


সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০২২

Jagannath Temple, Gopinathpur, Keshpur Police Station, Paschim Medinipur

  জগন্নাথ  মন্দির,  গোপীনাথপুর,  কেশপুর  থানা,  পশ্চিম  মেদিনীপুর

                 শ্যামল  কুমার  ঘোষ

            পশ্চিম  মেদিনীপুর  জেলার  কেশপুর  থানার  অন্তর্গত  গোপীনাথপুর  একটি  গ্রাম।  মেদিনীপুর  শহর  থেকে  বাগরুই  গ্রামের  দূরত্ব  ২৩  কিমি।  বাগরুই  গ্রাম  থেকে  গোপীনাথপুরের  দূরত্ব  ৫ / ৬  কিমি।  তারাপদ  সাঁতরা  ও  প্রণব  রায়  তাঁদের  গ্রন্থে  গ্রামটিকে  বাদাড়  গোপীনাথপুর  বলে  উল্লেখ  করেছেন।  গ্রামের  দু-এক  জন  আমার  কাছেও  বাদাড়  বলে  উল্লেখ  করেছেন।  গ্রামে  নবরত্ন  জগন্নাথ  মন্দিরটি  উল্লেখযোগ্য।

            ইঁটের  তৈরি  পূর্বমুখী  মন্দিরটি  দৈর্ঘ্য  ও  প্রস্থে  ৭.২৬  ও  ৭.১৬  মি.  এবং  উচ্চতায়  প্রায়  ১৫.২৪  মি।  সামনে  ত্রিখিলান  প্রবেশপথযুক্ত  অলিন্দ।  গর্ভগৃহে  প্রবেশের  একটিই  দরজা,  সামনে  অর্থাৎ  পূর্বদিকে।  মন্দিরে  আগে  একটি  প্রতিষ্ঠাফলক  ছিল।  কিন্তু  পূর্বে  এর  পাঠোদ্ধার  করা  যায়  নি।  বর্তমানে  কোন  প্রতিষ্ঠাফলক নেই।  সংস্কারের  সময়  এটি  হারিয়ে  গেছে।  প্রণব  রায়  লিখেছেন,  স্থাপত্য  ও  পোড়ামাটির  কাজের  বৈশিষ্ট্য  লক্ষ্য  করে  মন্দিরটি  খ্রিস্টীয়  আঠারো  শতকের  গোড়ার  দিকে  প্রতিষ্ঠিত  বলে  অনুমান  করা  যায়।  তারাপদ  সাঁতরা  লিখেছেন,  মন্দিরের  সেবাইতগণের  পক্ষ  থেকে  জানা  যায়  যে  এটি  ১১২৬  বঙ্গাব্দে  নির্মিত।  মন্দিরটি  কর্ণগড়ের  কোন  রাজা  নির্মাণ  করে  দেন  এবং  মন্দিরের  সেবাকার্য  সুষ্টভাবে  পরিচালনার  জন্য  কয়েক  শ  বিঘা  লাখেরাজ  জমি  দান  করেন।  সে  জমির  সামান্যই  আজ  মন্দির  কর্তৃপক্ষের হাতে  আছে।   

            মন্দিরে  টেরাকোটার  প্রাচুর্য  বিশেষভাবে  উল্লেখযোগ্য।  তবে  রঙ  করার  ফলে  টেরাকোটার  সৌন্দর্য  অনেকটাই  আজ  ম্লান।  পূর্ব  দিকের  প্রথম  তলের  উল্লেখযোগ্য  টেরাকোটা  ফলকগুলি :  ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর,  সঙ্গে  নারদ।  সমুদ্রমন্থনে  লক্ষ্মীর  উদ্ধার,  রথারূঢ়  সূর্যদেবের  আবির্ভাব  এবং  কৃতাঞ্জলিপুটে  ভক্তবৃন্দের  স্তুতি,  ভগীরথের  গঙ্গা  অনোয়ন,  কৃষ্ণ  কথা,  সুপার্শ্ব কর্তৃক রাবণকে বাধাদান, অশোকবনে সীতা,  মারীচ  বধ  ও  অন্যান্য  রামায়ণ  কাহিনী।  এই  দিকে  দ্বিতলেও  টেরাকোটার  অলঙ্করণ  বর্তমান।  সেখানে  রামরাবণের  যুদ্ধ,  ভীষ্মের  শরশয্যা,  শিকার  দৃশ্য  ইত্যাদি  লক্ষ্য  করা  যায়।  দক্ষিণ  দিকের  উল্লেখযোগ্য  ফলক :  জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার  মূর্তি।   

            গর্ভগৃহে  একটি  লম্বা  বেদির  উপর  আছেন  জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার  দারু  বিগ্রহ।  আর  আছেন  দারু  নির্মিত  একটি  ছোট  জগন্নাথ  বিগ্রহ  বা  বাল  জগন্নাথ।  পার্শ্বদেবতা  হিসাবে  আছেন  মহাদেব  ও  একটি  নারায়ণ  শিলা।  আলাদা  করে  আছেন  আরও  ৫১ টি  নারায়ণ  শিলা।  এছাড়া  ধাতু  নির্মিত  অন্যান্য  বিগ্রহও  আছেন।  সমস্ত  বিগ্রহ  নিত্য  পূজিত।  নিত্য  পূজা  ছাড়াও  মন্দিরে  জন্মাষ্টমী,  ঝুলন,  রাধাষ্টমী,  চাঁচর,  দোল,  রাস  ইত্যাদি  বৈষ্ণব  অনুষ্ঠান  পালন  করা  হয়।  দোল  উৎসব  বেশ  জাঁকজমক  সহকারে  পালন  করা  হয়।  পাঁচ  দিন  ধরে  চলে  উৎসব।  শেষ  দিনে  হয়  অন্নকূট  উৎসব।  এই  উপলক্ষ্যে  ২৫/৩০  হাজার  ভক্ত  পাত  পেড়ে  প্রসাদ  গ্রহণ  করেন।

            গর্ভগৃহের  কাঠের  দরজাটিও  দর্শনীয়।  দরজাটিতে  ৪৮  টি  ছোট  ছোট  বিভিন্ন  মূর্তি  ক্ষোদিত।  যদিও  অপরিপক্ক  হাতে  রাসায়নিক  রং  করার  ফলে  তা  অনেকটাই  আজ  ম্লান।   

            বাদাড়-গোপীনাথপুর  গ্রামের  এই  মন্দিরটি  পুরীর  মাধবদাস  মঠের  অধীন।  ১৯  শতকের  শেষ  দিকে  এই  স্থান  ম্যালেরিয়ায়  জনশূন্য  হয়ে  যায়।  ফলে  চারপাশ  বনবাদাড়ে  পূর্ণ  হয়ে  যায়।  টিমটিম  করে  চলতে  থাকে  মন্দিরের  কাজকর্ম।  পরে  ২০  শতকের  ৫০-এর  দশক  থেকে  আবার  এখানে  বসবাস  শুরু  হয়।  লোক  বসতি  একটু  বেশি  হলে  গ্রামের  লোকেরাই  এগিয়ে  আসেন  মন্দিরটিকে  রক্ষা  করতে।  পরে  আশেপাশের  অনেক  গ্রামের  লোকেরা  এতে  যুক্ত  হন।  ক্রমে  জগন্নাথের  নামে  একটি  ট্রাস্টি  বোর্ড  গঠিত  হয়।  মন্দিরটির  সংস্কার  করা  হয়।  সুষ্ট  ভাবে  বিগ্রহের  সেবার  ব্যবস্থা  করা  হয়।  পরে  অন্যান্য  অনুষ্ঠানের  সঙ্গে  নতুন  করে  রথযাত্রার  সূচনা  করা  হয়। 

            গ্রামবাসীদের  দানেই  বিগ্রহের  সেবাকার্য  পরিচালনা  করা  হয়।  সকালে  মিছরি।  দুপুরে  অন্নভোগ  দেওয়া  হয়।  ব্যঞ্জন  ঘিয়ে  রান্না  করা  হয়।  সন্ধ্যায়  দুধ,  মিছরি  ও  ফল  দেওয়া  হয়।  গ্রামবাসীদের  দেওয়া  মানসিক  পুজোর  দিন  পরমান্ন  সহ  অন্নভোগ  নিবেদন  করা  হয়।  আগেই  উল্লেখ  করেছি  যে  কর্ণগড়ের  রাজারা  জগন্নাথের  নামে  যে  লাখেরাজ  জমি  দিয়েছিলেন  তার  সামান্য  অংশই  আজ  অবশিষ্ট  আছে।  তবে  সেই  অবশিষ্ট  চাষের  জমির  পাওনা  ফসল  চাষিরা  জগন্নাথের  সেবার  জন্য  দেন।  এই  ফসলের  সবটা  সেবার  জন্য  দরকার  হয়  না।  অতিরিক্ত  ফসল  বিক্রি  করে  তহবিলে  রাখা  হয়।  মন্দিরটির খোঁজ  আমি  চিন্ময়  বাবুর  ( চিন্ময়  দাস )  কাছে  পেয়েছিলাম।  তাঁকে  ধন্যবাদ।   

            কী  ভাবে  যাবেন ?

            কলকাতা  থেকে  ট্রেনে  বা  বাসে  মেদিনীপুর  শহর।  সেখান  থেকে  কেশপুর,  ঘাটাল  বা  চন্দ্রকোনা  গামী  বাসে  জামতলা  মোড়।  সেখান  থেকে  ট্রেকারে  মুক্তিকেন্দ্র।  মুক্তিকেন্দ্র  থেকে  ডান  দিকে  আধ  কিমি  হেঁটে  বাগরুই  গ্রাম  ও  লক্ষ্মীবরাহ  মন্দির।  এই  মন্দির  দেখে  কংসাবতী  তীরের  আঁকাবাঁকা  বাঁধ-রাস্তায়  আরও  পাঁচ / ছয়  কিলো  মিটার  গেলে  পাবেন  গোপীনাথপুর  গ্রাম।  তবে  এই  পথে  বাস,  টোটো  বা  অটো  কিছুই  পাবেন  না।  পাবেন  শুধু  পথ  চলতি  সাইকেল  বা  বাইক  আরোহী।  তাঁদেরই  কাউকে  অনুরোধ  করে  পিছনে  উঠে  পড়তে  হবে।  যেমন  আমি  করেছিলাম।  আর  একটি  বিকল্প  পথ  আছে।  মেদিনীপুর  থেকে  বাসে  ডেবরা  বাজার।  সেখান  থেকে  টোটোতে  পশ্চিম  লহনা।  সেখান  থেকে  হেঁটে  বাঁশের  সাঁকোতে  কংসাবতী   নদী  পেরিয়ে  গোপীনাথপুরের  জগন্নাথ  মন্দির।  এই  পথেই  আমি  ফিরেছিলাম।

 ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর, সঙ্গে নারদ

   

জগন্নাথ মন্দির ( দক্ষিণ দিক থেকে তোলা )

জগন্নাথ মন্দির ( সামনে থেকে তোলা )

মন্দিরের ত্রিখিলান বিন্যাস 

বাঁ দিকের খিলানের উপরের কাজ 

 ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর, সঙ্গে নারদ

রথারূঢ় সূর্যদেবের আবির্ভাব এবং ভক্তবৃন্দের স্তুতি,
                সমুদ্রমন্থনে লক্ষ্মীর উদ্ধার ও অন্য দুটি চিত্র 
মাঝের খিলানের উপরের কাজ 

রামায়ণ কাহিনী 

সুপার্শ্ব কর্তৃক রাবণকে বাধাদান ও অশোকবনে সীতা 

ডান দিকের খিলানের উপরের কাজ 

কৃষ্ণ লীলা 

মন্দিরের শিখর ( সামনে থেকে )

পূর্ব দিকের দ্বিতলের ত্রিখিলান বিন্যাস 

বাঁ দিকের খিলানের উপরের কাজ 

মাঝের খিলানের উপরের কাজ 

ডান দিকের খিলানের উপরের কাজ 

দক্ষিণ দিকের ত্রিখিলান বিন্যাস 

কুলুঙ্গির কাজ -১

কুলুঙ্গির কাজ -২

কুলুঙ্গির কাজ -৩

মন্দিরের  ফটক 

দরজার কাঠের ভাস্কর্য (বৃষোপরি  শিব )

দরজার কাঠের ভাস্কর্য (কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ )


দরজার কাঠের ভাস্কর্য (গোপীদের বস্ত্রহরণ )

দরজার কাঠের ভাস্কর্য (মহিষাসুরমর্দিনী )

দরজার কাঠের ভাস্কর্য 

দরজার কাঠের ভাস্কর্য

জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা ও অন্যান্য বিগ্রহ 


                       ---------------------------------------------------


অগ্রদ্বীপের গোপীনাথকে নিয়ে নদিয়ার কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে শোভাবাজার রাজবাড়ির মহারাজা নবকৃষ্ণের মামলা হয়েছিল এবং সে মামলা প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। বিষ্ণুপুরের প্রাণের দেবতা মদনমোহনকে মল্লরাজ চৈতন্য সিংহ কলকাতার গোকুল মিত্রের কাছে বন্ধক দিয়েছিলেন। আড়ংঘাটার যুগলকিশোর দর্শন করতে আসা মহিলাদের বিশ্বাসজ্যৈষ্ঠমাসে যুগলকিশোর দর্শন করে পুজো দিলে  জন্মেএমনকি পরজন্মেও  বৈধব্যদশা ভোগ করতে হয় না। বিধবাদেরও পরজন্মে বৈধব্যদশা ভোগ করতে হবে না। অনেক ভক্তদের বিশ্বাসশ্রীরামপুরের বল্লভপুরের রাধাবল্লভখড়দহের শ্যামসুন্দর এবং 
সাঁইবনার নন্দদুলাল -এই তিনটি বিগ্রহ উপবাসে থেকে একই দিনে দর্শন করলে আর
পুনর্জন্ম হয় না।

 বঙ্গের এইরকম চোদ্দোটি মন্দির  বিগ্রহের অজানা কাহিনি নিয়ে আমার লেখা এবং 'রা প্রকাশন' কর্তৃক প্রকাশিত বই  'মন্দির ও বিগ্রহের কাহিনি' মুদ্রিত মূল্য: ৩৯৯ টাকা। 



রামায়ণের ৭টি খণ্ডের ৬৪ টি উপাখ্যান ও ১৮৫ টি টেরাকোটা ফলকের আলোকচিত্র সংবলিত আমার লেখা এবং 'রা প্রকাশন' কর্তৃক প্রকাশিত বই 'বাংলার টেরাকোটা মন্দিরে রামায়ণ'। বইটির মুদ্রিত মূল্য - ৫৯৯ টাকা।



 বই দুটি ডাক যোগে সংগ্রহ করতে হলে যোগাযোগ করুন :  9038130757 এই নম্বরে। 

কলকাতার কলেজস্ট্রিটের চার মাথা মোড়ের হাওড়ার দিকের রাস্তায় ৯৩, মহাত্মা গান্ধী রোডে অবস্থিত হিন্দু সৎকার সমিতি বিল্ডিং-এর দু তলায় ( টেকনো ওয়ার্ল্ড -এর বিপরীতে ) 'রা প্রকাশনে ও মুদ্রণের' বিপণি 'রা বইহেমিয়ন'। ওখান থেকে বইটি সংগ্রহ করতে পারেন। কোনও অসুবিধা হলে উপরোক্ত নম্বরে ফোন করতে পারেন।